http://shamsfood.com/

বাঙালীর প্রাণ বৈশাখী মেলা

 Untitled-1 copy

 

‘এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি মেলায় যাইরে,

বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে ললনারা হেটে যায়,

বখাটে ছেলের ভীড়ে ললনাদের রেহাই নাই’ ।।

-মাকসুদুল হক ।

 imagesহাসান ইমাম রাসেল – বাঙালী এবং বৈশাখী মেলা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিট । বাঙালী তার নিজস্ব জাতি সত্ত্বার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যতগুলো উৎসব পালন করে তার মধ্যে বৈশাখ বরণ বা বাংলা সনকে বরণ অন্যতম । বৈশাখ বরণের সাথে যে অনুষ্ঠানটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তা হল বাঙালীর ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা । মূলত সমগ্র বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গে বৈশাখ মাসের পহেলা দিন থেকে একযোগে যে মেলা অনুষ্ঠিত হয় তাকেই বৈশাখী মেলা বলা হয় । পয়েলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে যে সকল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় তার মধ্যে যেমন পান্তা-ইলিশ থাকে তেমনি মেলাও বসে । এ মেলায় শুধু দু’ই বাঙলার তরুন-তরুনীরাই অংশগ্রহন করে না বরং যে সকল মানুষেরা বাঙালীত্বকে হৃদয়ে লালন করে, বাঙালীর কৃষ্টি-কালচার এবং ঐহিত্যকে ভালবাসে তারা সবাই বৈশাখী মেলায় অংশ গ্রহন করে । তাইতো দেখা যায় বৈশাখী মেলায় অংশগ্রহনকারীরা বিভিন্ন বয়সের হয়ে থাকেন । এখানে বয়স কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না । বৈশাখি মেলার মাধ্যমে বাঙালীদের মধ্যে একটি মেল বন্ধনের সুতিকাগার রচিত হয় । সকল ভেদাভেদ ভূলে বাঙালীরা তাদের প্রকৃত সংস্কৃতিকে লালন এবং ধারণ করার শপথে আগুয়ান হয় । এ মেলা যেমন দেশীয় পরিমন্ডলের মধ্যে বাঙালীকে ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করে তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাঙালীকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় । যে কারনে বাঙালীকে বিশ্ববাসী স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে, নিজস্ব স ংস্কৃতির ধারক হিসেবে আজও সম্মান করে । ১৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই নভেম্বর থেকে হিজরী, চন্দ্রাসন ভ্যতা ও স ও ইংরেজী সৌরসনকে ভিত্তি করে বংলা সন প্রবর্তিত হয় । নতুন সনটি প্রথমে ফসলি সন নামে পরিচিত থাকলেও পরবর্তীতে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি পায় । তাই বলা যায় বংলা নববর্ষ যেহেতু স¤্রাট আকবরের সময় থেকে পালন করা হত  এবং সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার, এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীদের খাজনা পরিশোধ করত । এ উপলক্ষ্যে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো । পরবর্তীতে বৈশাখ উপলক্ষে যে মেলার আয়োজন করা হত সে মেলাকে ‘বৈশাখী মেলা’ নামে নামকরণ করা হয় । সুতরাং বৈশাখী মেলার সূচনার সঠিক তারিখ নির্ধারিত করা না গেলেও এ মেলা যে বাংলা বঙ্গাব্দ পালনের সূচনা থেকেই সূচিত হয়েছে তাতে সন্দেহ থাকার খুব বেশি অবকাশ নাই ।

 

বাংলা নববর্ষের মূল আকর্ষণ বৈশাখী মেলা । মূলত নতুন বছর বরণকে উৎসবমূখর করে তোলে এ মেলা । বৈশাখী মেলা মূলত সার্বজনীন লোকজ মেলা হিসেবে স্বীকৃত । এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে । উপস্থিত দর্শকদের আনন্দ দেয়ার জন্য নানাবিধ আয়োজন করা হয় । এ সব আয়োজনের মধ্যে স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সকল প্রকার হস্ত শিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্র উপস্থিত করার রেওয়াজ রয়েছে। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী ইত্যাদি এবং বিভিন্ন  লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন ঃ চিড়া, মুড়ি-মুড়কি, খৈ, বাতাসা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় খাবারের সমারোহ থাকে । মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে । বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিত করা হয় । তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরাগান, গাজীর গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালী ইত্যাদি বিভিন্ন আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন । লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয় । চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি বৈশাখী মেলার বিশেষ আকর্ষণ । এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ । শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজে এখনও বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালীদের কাছে এক আনাবিল আনন্দের মেলায় পরিণত হয় । বৈশাখী মেলা বাঙালীর আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক । বৈশাখ বরণ উপলক্ষে এবং বিনোদন দেয়ার মানসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলার প্রচলন আছে । তবে এমন অনেকগুলো স্থান রয়েছে যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দীধরে বৈশাখী মেলা বসছে এবং সে স্থানগুলো দেশাবাসীর কাছে বিখ্যাতির মর্যাদা পেয়েছে । বৈশাখী মেলা বসায় যে স্থানগুলো সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছে তার সংখ্যাও নেহাত কম নয় । এ সকল বিখ্যাত স্থানের মধ্যে কয়েকটি হল-নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছুড়ি ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, নোয়াখালী,চট্রগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল,সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি-বাটনাতলা, গোপলগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গিপারা, মুজিবনগর এলাকা ইত্যাদি ।

http://shamsfood.com/