http://shamsfood.com/

বিশ্ব ভালবাসা দিবস : যা পালনে অবনতি ছাড়া উন্নতি নাই

imagesসকালের নোয়াখালী ডট কম::;বছরের ৩৬৫ দিনকে ঘিরে কতগুলো দিবসের যে জন্ম হয়েছে তার নির্দিষ্ট সংখ্যা জানতে খাতা-কলম কিংবা ক্যালকুলেটার নিয়ে বসতে হবে । যদিও ২৪ ঘন্টায় একদিন কিন্তু এই একদিনেই একাধিক দিবস পালনের সংস্কৃতি চালু হতে শুরু করেছে । কিছু কিছু দিবস বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে আবার কতগুলো নির্দিষ্ট পরিসরেই আবদ্ধ রয়েছে । কোন দিবসের কথা উঠলেই মানুষ অন্ধভাবে তা অনুকরণ করার প্রতিযোগীতায় নামে । এসব দিবস পালনে জাতি কতটুকু উপকৃত হচ্ছে তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের হিসাব ছাড়াই মানুষ বিশেষ করে বাংলাদেশীরা ঘটা করে পালন করছি হাজারো দিবস । তেমন একটি ‘বিশ্ব ভালবাসা’ দিবস একেবারেই অত্যাসন্ন । বিশ্বব্যাপী চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি, কিভাবে বরণ করা যায় ’১৫ এর ১৪ ফ্রেব্রুয়ারীর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে । বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই । ইতোমধ্যেই তরুন-তরুনীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা পরিলক্ষিতি হতে শুরু হয়েছে । কত রংয়ের, ঢংয়ের আয়োজন হবে এই দিনে । দিন-রাতভর চলবে আয়োজনের চোখ ধাঁধাঁনো জলকানী । বিশ্বায়ণের সূত্রে পাওয়া পশ্চিমা এ সংস্কৃতি আমাদের সাংস্কৃতির ঐতিহ্যের সাথে কতটা মানানসই এবং কতটা সূফল-কূফল দিচ্ছে তা কি একবারও ভেবে দেখেছি ? বাঙালী জাতি হিসেবে আমাদের আছে ঐতিহ্যবাহী সম্মৃদ্ধ সংস্কৃতি অথচ আমরা আমাদের জাতি সত্ত্বার সাথে ওৎপ্রতোভাবে জড়িত সে সংস্কৃতির খোঁজ-খবর রাখি না বললেই চলে । আমাদের কাছে বছরের ৩৬৫ দিন ভালবাসার অথচ একটি বিশেষ দিনকে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধকরে বাকীদিনগুলোক ভালবাসাহীন করে চালাতে চাইছি । সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে যে ভালবাসা উদার ও চিরন্তনভাবে বয়ে আসছে, মাঝপথে এসে সে ভালবাসায় বাধার সৃষ্টি করে ভালবাসাকেও করে ফেলছি সংকীর্ণ । ভালবাসা দিবসের দিনটি আমাদের সামনে উপস্থিত হলে আমরা হিতাহীত জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকি উম্মাদের মত যে কেউ আমাদেররকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে । একবারও গভীরভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে চাই না ভালবাসা দিবসের উৎপত্তির সঠিক ইতিহাস । মনেও প্রশ্ন জাগে না, কোন কারণে আমরা বিশেষ একটি দিনের খাঁচায় বন্দি করে ফেলছি মুক্ত, অবাধ ও স্বাধীন ভালাবাসাকে । শুধু নিষিদ্ধ যৌবন কামনার তাড়নায় আষ্টে-পৃষ্ঠে আটকে গেছে আমাদেরব বিচার-বুদ্ধিবোধ, বিবেক । ভালবাসা দিবস বলতেই তরুণ-তরুণীরা হুঁশ হারিয়ে উম্মাদনায় মাতছে । যে সকল দেশ থেকে ভালবাসা একেবারেই পরবাসী হয়েছে সে সকল দেশের মানুষ ভালবাসা দিবস পালন করে কিছুটা লাভবান হলেও বাংলাদেশের মত একটি আদর্শিক সংস্কৃতির ধারক ও ধর্মীয় চেতনার দেশে উচ্ছৃঙ্খলতায় পূর্ণ ভালবাসা দিবস পালনের নামে যা করা হয় তা আদৌ কাম্য নয় এবং নয় মানানসই । যে দেশের মানুষের জীবনের সকল পরতে-পরতে ভালবাসায় ভরপুর তারা নির্দিষ্ট একটি দিন কেন্দ্রিক ভালবাসাকে পুঁঞ্জিভূত করে ফেলবে, এটা কখনো হবার নয় । বিশেষত আমরা যে ইতিহাসগুলোকে স্মরণ করার মানসে ভালবাসা দিবসকে পালন করি, সেসকল ঘটনাগুলোতে প্রকৃত ভালবাসার ছিটেফোঁটাও ছিল কিনা তা নিয়ে আছে গুরুতর জিজ্ঞাসা ।

যদি ভালোবাসা দিবসের সংজ্ঞা ও পরিচয় জানতে চাওয়া হয় তবে বলতে হবে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ১৪ই ফ্রেব্রুয়ারীকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ বলা হয় । বছরের ৩৬৫ দিন থেকে মাত্র একটি দিন ও রাতকে প্রেম সরোবরে ডুব দেয়া, সাঁতার কাটা, চরিত্রের নৈতিক ভূষণ খুলে প্রেম সরোবরের সলিলে হারিয়ে যাওয়ার দিবস হচ্ছে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ বা ‘ভালবাসা দিবস’ । উল্লেখ্য যে, এ দিনটিকে ‘লাভ ডে’ অথবা ‘লাভার্স ফেস্টিভ্যাল’ বলা হয় না । অথচ আমাদের দেশে ‘সেন্ট ভালেন্টাইন্স ডে’ এর অনুবাদ করা বলা হচ্ছে ‘ভালবাসা দিবস’ । এরুপ অনুবাদের কারণে এদেশের সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে । ভালবাসা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শব্দ । মূল শব্দের অনুবাদ বিকৃত করে ‘ভালবাস দিবস’ বলায় এটা যে ভিন্ন দেশ ও ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে এসেছে সেটা সহজে বুঝা যাচ্ছে না । বাংলাদেশের মত অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ তার নিজ নামের পরিবর্তে অনুবাদের ছদ্মবরণে প্রবেশ করছে । ফলে এ দিবসের প্রকৃত অর্থ, উৎপত্তির কারণ ও ইতিহাস অনেকের কাছেই অজানা থেকে যাচ্ছে । অনেকটা হুজুগের বশবর্তী হয়ে বিজাতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, রীতি-নীতিতে লালিত ও পরিপুষ্ট একটি উৎসবের দিনকেও দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশেষ করে তরুন-তরুনীরা, যুবক-যুবতীরা নিজেদের অন্যতম উৎসবের দিন হিসেবে গ্রহন করছে । বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি যাদের সবচাইতে বেশি সেই তারাই ভালাবাসা দিবসের নামে চরিত্রহানীর উৎসবকে আপন করে নিয়েছে ।

‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ (Saint Valentine’s Day) এর প্রথম শব্দটিই এ দিনটির আসল পরিচয়ের জানান দেয় । Advanced Oxford Learners’ Dictionary তে Saint শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে-A person declared to be holy by the Christian Church because of her/his qualities or good works. অর্থ্যাৎ, এমন ব্যক্তি, খৃষ্টান গীর্জা কর্তৃক যাকে তার গুনাবলী বা ভাল কাজের জন্য পবিত্র সত্ত্বা হিসেবে ঘোষণা করা হয । আর Valentine শব্দের অর্থ ভালবাসা নয় । Valentine মূলত একজন ব্যক্তির নাম । খ্রীষ্টধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গ করার কারণে যাকে গীর্জা কর্তৃক Saint (পবিত্র সত্ত্বা) ঘোষণা দেয়া হয়েছিল । সুতরাং সহজেই বুঝা যায়, গীর্জা কর্তৃক ‘পবিত্র সত্ত্বা’ হিসেবে ঘোষিত একজন ধর্মযাযকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এ দিনটি উদযাপনের মূল কারণ ।

‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ এর ইতিহাস অতিপ্রাচীন । এর উৎস হচ্ছে আজ থেকে প্রায় ১৭শ’ বছর আগের পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত ‘আধ্যাত্মিক ভালবাসা’র উৎসব । এ পৌত্তলিক উৎসবের সাথে কিছু কল্পকাহিনী জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে রোমীয় খৃষ্টানদের মাঝে প্রচলিত হয । এ সমস্ত কল্প-কাহিনীর অন্যতম হচ্ছে, এ্ দিনে পৌত্তলিক (অগ্নি উপাসক) রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত ‘রোমিউলাস’ নামক জনৈক ব্যক্তি একদা নেকড়ের দুধ পান করায় অসীম শক্তি ও জ্ঞানের অধিকারী হয়ে প্রাচীন রোমের প্রতিষ্ঠা করেন । পৌরাণিক এক কাহিনীকে কেন্দ্র করে ১৪ ফ্রেবুয়ারী একটি জমকালো উৎসব পালন করত রোমানরা । এ দিনে যে সকল বিচিত্র অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হত তার মধ্যে অন্যতম ছিল, দু’জন শক্তিশালী পেশীবহুল যুবক গায়ে কুকুর ও ভেড়ার রক্ত মাখত । অত:পর দুখ দিয়ে সেসকল রক্ত ধুয়ে ফেলার পর এ দু’জন লোককে সামনে রেখে বের করা হত দীর্ঘ পদযাত্রা । এ দু’যুবকের হাতে চাবুক থাকত, যা দিয়ে তারা পদযাত্রার সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীকে আঘাত করত । রোমান মহিলাদের মাঝে কুসংস্কার ছিল যে, তারা যদি চাবুকের আঘাত গ্রহন করে, তবে তারা বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তি পাবে । এ উদ্দেশ্যে মহিলারা পদযাত্রার সামনে দিয়ে যাতায়াত করত । রোমকরা খৃষ্টধর্ম গ্রহনের পরও এ উৎসব উদযাপন অব্যাহত রাখে । তবে পৌত্তলিকতার খোলস পাল্টে তারা এ উৎসবকে ভিন্ন এক ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয় । সেটা হচ্ছে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক জনৈক খৃষ্টান সন্ন্যাসীর জীবনোৎসর্গ করার ঘটনা । ইতিহাসে এরকম দু’জন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কাহীনির সন্ধান পাওয়া যায় । এদের একজন সম্পর্কে দাবী করা হয়, তিনি শান্তি ও প্রেমের বানী প্রচারের ব্রত নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন । তাদের স্মরণে খৃষ্টনরা তাদের উৎসবকে অব্যাহত রাখে । সময়ের আবর্তে ‘আধ্যাত্মিক ভালবাসার’ উৎসব রুপান্তরিত হয় জৈবিক কামনা ও যৌনতার উৎসবে । তবে এ উৎসব খৃষ্টধর্মের প্রাণকেন্দ্র তথা ইতালীতে নিষিদ্ধ করা হয় । কিন্তু আঠারো ও উনিশ শতকে তা পূনরায় চালু হয় । ক্যাথলিক বিশ্বকোষে ভ্যালেন্টাইন ডে সম্পর্কে তিনটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় । তবে বিভিন্ন বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা উদ্ধৃত হয়েছে । সেগুলো থেকে প্রসিদ্ধ কয়েকটি ঘটনা পাঠকের সচেতনার্থে নিম্নে তুলে ধরা হল-

প্রথম বর্ণনা : রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লাডিয়াস এর আমলে ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন শিশু-প্রেমিক, সামাজিক ও সদালাপী এবং খৃষ্ট ধর্ম-প্রচারক । অপরদিকে রোম সম্রাট ছিলেন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী । সম্রাটের তরফ থেকে ভ্যালেন্টাইনকে দেব-দেবীর পূজা করতে বলা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন । ফলে ভ্যালেন্টাইনকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং ২৭০ খৃষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে সম্রাট ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে হত্যা করেন ।

দ্বিতীয় বর্ণনা : সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারারুদ্ধ হওয়ার পর প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীরা অনেকেই প্রতিদিন তাকে কারাঘারে দেখতে আসত এবং ফুল উপহার দিত । আগন্তুকরা বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপ্ত রাখত । জনৈক কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়েও ভ্যালেন্টাইনের সাথে প্রত্যহ সাক্ষাৎ করতে আসত । অনেক্ষণ ধরে তারা দু’জন প্রাণ খুলে কথা বলত । এক সময় ভ্যালেন্টাইন মেয়েটির প্রেমে পড়ে যায় । সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকৎসায় অন্ধ মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় । ভ্যালেন্টাইনের সাথে কারারক্ষীর মেয়ের সম্পর্ক এবং ভ্যালেন্টাইনের প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালবাসার কথা সম্রাটের কানে পৌঁছে । এতে সম্রাট ক্ষিপ্ত হয়ে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন । তথ্যমতে, তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল ২৬৯ খৃষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারী ।

তৃতীয় বর্ণনা : সমস্ত ইউরোপে যখন খৃষ্টান ধর্মের জয়জয়কার তখনও বড় আয়োজন করে পালিত হত রোমীয় একটি রীতি । মধ্য ফেব্রুয়ারীতে গ্রামের সকল যুবকেরা সমস্ত মেয়েদের নাম চিরকুটে তুলত, অতপর লটারীর মাধ্যমে যার হাত যে মেয়ের নাম উঠত, সে যুবক পূর্ণবৎসর ঐ মেয়ের প্রেমে মগ্ন থাকত । আর তাকে চিঠি লিখতে এ বলে যে, ‘প্রতিমা মাতার নামে তোমায় প্রেরণ করছি’। বৎসর সমাপান্তে এ সম্পর্ক নবায়ণ বা পরিবর্তন করা হত । এ রীতিটি কতক পাদ্রীর গোচরীভূত হলে তারা একে সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব ভেবে শুধু নাম পাল্টে দিয়ে একে খৃষ্টান ধর্মায়ণ করে দেয় এবং ঘোষণা করে, এখন থেকে এ পত্রগুলো প্রতিমা মাতার নামে প্রেরণ না করে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ এর নামে প্রেরণ করতে হবে । কারণ এটা খৃষ্টান নির্দশন, যাতে কালক্রমে এটা খৃষ্টান ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায় ।

চতুর্থ বর্ণনা : প্রাচীন রোমে দেবতাদের রাণী জুনো (Junno)’র সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারী ছুটি পালন করা হত । রোমানরা বিশ্বাস করত যে, জুনোর ইশার-ইঙ্গিত ছাড়া কোন বিয়ে সফল হয় না । ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারী লুপারকালিয়া ভোজ উৎসবে হাজারো তরুনের মেলায় র‌্যাফেল ড্র্র’র মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গী বাছাই পক্রিয়া চলত । এ উৎসবে উপস্থিত তরুণীরা তাদের নামাঙ্কিত কাগজের সিপ জনসম্মুখে রাখা একটি বড় পাত্রে ফেলত । সেখান থেকে যুবকের তোলা সিপের তরুণীকে কাছে ডেকে নিত । কখনও এ জুটি সারা বছরের জন্য স্থায়ী হত এবং ভালবাসার সিঁড়ি বেয়ে বিয়েতে পরিনতি ঘটত ।
পঞ্চম বর্ণনা : রোমানদের বিশ্বাসে ব্যবসা, সাহিত্য, পরিকল্পনা ও দস্যুদের প্রভু ‘আতারিত এবং রোমানদের সবচেয়ে বড় প্রভূ ‘জুয়াইবেতার’ সম্পর্কে ভ্যালেনটাইনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল । এদের সম্পর্কে ভ্যালেন্টাইন বলেছিল, এগুলো সব মানব রচিত প্রভূ, প্রকৃত প্রভূ হচ্ছে ‘ঈসা মসীহ’ । এ কারণে তাকে ১৪ ফ্রেব্রুয়ারীতে হত্যা করা হয় ।
ষষ্ঠ বর্ণনা : কথিত আছে, খৃষ্টধর্মের প্রথম দিকে নেতিক চরিত্র বিনষ্টের অপরাধে রোমের কোন এক গীর্জার ভ্যালেন্টাইন নামক দু’জন সেন্ট (পাদ্রী) এর মস্তক কর্তন করা হয় । তাদের মস্তক কর্তনের তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারী । ভক্তেরা তাদের ‘শহীদ’(!) আখ্যা দেয় । রোমান ইতিহাসে শহীদের তালিকায় এ দু’জন সেন্টের নাম রয়েছে । একজনকে রোমে এবং অন্যজনকে রোম থেকে ৬০ মাইল (প্রায় ৯৭ কি.মি) দূরবর্তী ইন্টরামনায় (বর্তমান Terni) এ ‘শহীদ’ করা হয় । ইতিহাসবিদগণ কর্তৃক এ ঘটনা স্বীকৃত না হলেও দাবী করা হয যে, ২৬৯ খৃষ্টাব্দে ‘ক্লাইডিয়াস দ্যা গথ’ এর আমলে নির‌্যাতনে তাদের মৃত্যু ঘটে । ৩৫০ খৃষ্টাব্দে রোমে তাদের সম্মানে এক রাজপ্রাসাদ (Basillica) নির্মাণ করা হয় । ভূর্গভস্থ সমাধিতে একজনের মৃতদেহ রয়েছে বলে অনেকের ধারণা ।
সপ্তম বর্ণনা : ৮২৭ খৃষ্টাব্দে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ব্যক্তি রোমের পোপ নির্বাচিত হয়েছিল । তিনি তার চারিত্রিক মাধুর‌্য এবং সুন্দর ব্যবহার দিয়ে অল্প দিনের মধ্যেই রোমবাসীর মন জয় করে নিয়েছিল । কিন্তু মাত্র ৪০ দিন দায়িত্ব পালনের পরেই তার জীবনাবসান ঘটে । প্রিয় পোপের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারী রোমবাসী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল । অনেকের মতে এভাবেই ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র সূচনা হয় । পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে এ দিনে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উপহার বিনিময় হয় । উপহার সামগ্রীর মধ্যে থাকে পত্র বিনিময়, খাদ্য দ্রব্য, ফুল, বই, ছবি, `Be my Valentine’(আমার ভ্যালেন্টাইন হও), প্রেমের কবিতা, গান কার্ড প্রভৃতি । গ্রীটিং কার্ডে, উৎসব স্থলে অথবা অন্য স্থানে প্রেমদেব (Cupid) এর ছবি বা মূর্তি স্থাপিত হয় । সেটা হল একটি ডানাওয়ালা শিশু, তার হাতে ধনুক এবং সে প্রেমিকার হৃদয়ের প্রতি তীর নিশান লাগিয়ে আছে । এ দিন স্কুল শিক্ষার্থীরা তাদের ক্লাসরুম সাজায় এবং অনুষ্ঠান করে ।১৮শ’ শতাব্দী থেকেই শুরু হয়েছে ছাপানো কার্ড প্রেরণ । এ সব কার্ডে ভাল-মন্দ কথা, ভয়-ভীতি আর হতাশার কথাও থাকত । ১৮শ’ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যে সব কার্ড ভ্যালেন্টাইন ডে’তে বিনিময় হত তাতে অপমানজনক কবিতাও থাকত । তবে সবচেয়ে যে জঘন্য কাজ এ দিনে করা হয় তা হল, ১৪ ফেব্রুয়ারী মিলনাকাঙ্খী অসংখ্য যুগল সবচেয়ে বেশী সময় চুম্বনাবদ্ধ থাকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় । আবার কোথাও কোথাও চুম্বনাবদ্ধ হয়ে ৫ মিনিটি বা তার বেশি সময় অতিবাহিত করে ঐ দিনের অন্যান্য আয়োজনে অংশগ্রহন করে ।
বাংলাদেশের ‘যায়যায় দিন’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও বিটিভির এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় টক’শো “লাল গোলাপ শুভেচ্ছা” এর পরিচালক ও উপস্থাপক জনাব শফিক রেহমান বাংলাদেশে ভালবাসা দিবস চালুর জনক । এ দিবসে ভালবাসায় মাতোয়ারা থাকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলো । পার্ক, রোস্তোরাঁ, ভার্সিটির করিডোর, টিএসসি, ওয়াটার ফ্রন্ট, ঢাবির চারুকলার বকুলতলা, আশুলিয়া, কুয়াকাটা এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতসহ-সর্বত্র থাকে প্রেমিক-প্রেমিকাদের তুমুল ভীড় । ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষ্যে অনেক দম্পতিও উপস্থিত হয় প্রেমকুঞ্জগুলোতে । আমাদের দেশের এক শ্রেণীর তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী এমনকি বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও ভালোবাসা দিবসে নাচতে শুরু করে ! তারা পাঁচতারা হোটেলে, পার্কে, উদ্যানে, লেকপাড়ে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উপস্থিত হয় ভালবাসা বিলোতে, অথচ তাদের নিজেদের ঘর-সংসারে এক ফোঁটাও ভালবাসার উপস্থিতি নাই । আমাদের বাংলাদেশী ভ্যালেন্টাইনরা যাদের অনুরণে এ দিবস পালন করে, তাদের ভালবাসা জীবন-জ্বালা আর জীবন জটিলতার নাম; মা-বাবা, ভাই-বোন হারাবার নাম, নৈতিকতার বন্ধন মুক্ত হওয়ার নাম । তাদের ভালবাসার লক্ষ্যই ‘ধর-ছাড়’ আর ‘ছাড়-ধর’ নতুন নতুন সঙ্গী । ১৪ ফেব্রুয়ারী শুরু হলেও তাদের ধরা-ছাড়ার বেলেল্লাপনা চলতে থাকে সমগ্র জীবনব্যাপী ।
যে সকল যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী ও ছাত্র-ছাত্রীরা আগামী বাংলাদেশের কর্ণধর সেই তারাই যদি এমন বিপথগামী ও চরিত্রহননকারী দিবস পালনে অভ্যস্থ হয়ে যায় তবে দেশের ভবিষ্যত চির অন্ধকারে ছেয়ে যাবে । তাই নিজ ও দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে অভিভাবকদেরকে ১৪ ফেব্রুয়ারী এবং এ জাতীয় ক্ষতিকর দিবস পালনের ব্যাপারে সন্তানদের দিকে আরও বেশি মনোযোগী ও সচেতন হতে হবে । সন্তান-বিপথে গেলে অভিভাবকের ক্ষতিটাই সবচেয়ে বেশি । অনেক আধুনিক বাবা-মা বলেন, আমরা আমাদের সন্তানদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছি । এ সব অভিভাবকরা এ কথা বলে পাড় পেয়ে যেতে পারেন না । আপনাদের আবেগপ্রবন, অপ্রাপ্ত বয়সের সন্তানেরা আপনাদের দেয়া স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করে যা ইচ্ছা তা করে বেড়ালে সমাজে আপনাদেরকেই অপদস্থ এবং খেসারত দিতে হবে । সুতরাং আসন্ন ভালোবাসা দিবসের পূর্বেই সাবধান হোন । দরকার হলে কঠোরতা প্রদর্শণ করুণ । আপনার কঠোরতায় যদি আপনার স্নেহধন্য সন্তানের মঙ্গল হয় তাতে আপনার চেয়ে বেশি উপকৃত কেউ হবে না । সন্তান যাতে এ দিনে বাইরে গিয়ে অনৈতিক ও অন্যায় কিছুর সাথে জড়িত না হতে পারে তার জন্য প্রয়োজনে পরিবারের সকল সদস্য মিলে বাসায় বসে সামাজিক পরিবেশে আনন্দ করুন অথবা সবাই মিলে কোথাও বেড়িয়ে আসুন । এতে সন্তানের মারাত্মক ক্ষতি থেকে যেভাবে তাদেরকে রক্ষা করতে পারবেন তেমনি পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে । আর যে সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং তরুন-তরুনীরা বাবা-মা বা অভিভাবকদের ছেড়ে দূরে আছেন তার সংযমী হোন । মনে রাখতে হবে, আমার ভবিষ্যত আমার উপকারার্থে । আমি যত সভ্য-ভদ্র হতে পারব সমাজে আমার স্থান তত উর্ধ্বে হবে । খেয়াল রাখতে হবে, দেশি সংস্কৃতিকে ভূলে বিজাতীয় সংস্কৃতি গ্রহন করতে গিয়ে আমরা যেন ‘বাঁদুড়ে’ রুপান্তরিত না হই । বাঁদুড়ের স্বভাব হলো, সে একূলেও থাকতে পারে না আবার ওকূলেও যেতে পারে না । আমরা সভ্যতার উষালগ্নে দাঁড়িয়ে আছি । উন্নত জীবন আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে । আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য, সভ্যতা এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি । সুতরাং বিদেশী সংস্কৃতির পিছে না ছুটে আমাদের সংস্কৃতিকে শক্তভাবে ধারন এবং পালন করি । তাতে আমরা যেমন উপকৃত হব তেমনি আমাদের দেশটাও বিশ্বের দরবারে নিজস্ব পরিচিতি নিয়ে পরিচিতি পাবে । বাংলাদেশেকে সোনার দেশ, স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতির, সভ্যতার এবং স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করি ।
ভালবাসা দিবসটি ভালবাসার আদান-প্রদানের নামে সূচনা হলেও এই দিবসটি সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে । দিবসটি সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা ধ্বংস করে সমাজকে বিশৃঙ্খল এবং যুবক-যুবতীদের অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে । এ দিনটি পালনের অনেকগুলো অপকারীতা রয়েছে । যার মধ্যে থেকে কয়েকটি বিধৃত হল-
• ভালবাসা দিবস পালনের ফলে সমাজের যুবক-যুবতীরা বিপথগামী হচ্ছে ।
• এই দিনটি পালনের ফলে যুবক-যুবতীরা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ।
• এই দিনটির দরুন খৃষ্টান-নাসারারা তাদের উদ্দেশ্যকে সফল করতে পারছে । তারা ইসলামী চেতনায় আঘাত হানছে ।
• এই দিনটির ফলে অনেক তরুণীরা তাদের মহামূল্যবান সতীত্ব বিসর্জন দিচ্ছে ।
• এই দিনটি পালনের ফলে অনেক নারী-পুরুষ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে ।
• এই দিনটি পালনের ফলে নারী-পুরুষের অবাধ যৌন মিলনের ফলে এইডসের মত নানা ধরনের জটিল রোগব্যধি ছড়াচ্ছে ।
• এই দিনটিতে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অবাধ মেলা-মেশার মাধ্যমে সমাজে জন্ম নেয় অসংখ্য পিতৃ পরিচয়হীন (জারজ) সন্তান ।
ভালোবাসা দিবস সম্পর্কিত এসব জানা-অজানা তথ্য জানার পরেও বাংলাদেশী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে লালিত কোন নারী কিংবা পুরুষ কি এইদিনে তার প্রিয়জন থেকে কোন চিরকুট, প্রেমপত্র, লাল গোলাপ, ভ্যালেন্টাইন্স ডে কার্ড বা কোন উপহার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবে ? কিংবা এ দিনে তথাকথিত ভালবাসা বিনিময়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে । এরপরেও কেউ যদি এ দিবসকে ‍ঘিরে এমন কিছু করে তবে তা সামাজিক মূল্যবোধ ও নিজ দেশের মাটি ও মানুষের সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে আত্ম-বিস্মৃতির চরম দেউলিয়াপনা ছাড়া আর কি হতে পারে ? নিশ্চিতভাবে বলা যায় ভ্যালেন্টাইনের সাথে ভালবাসার কোন সম্পর্ক নাই । আমাদের ভালোবাসা নির্দিষ্ট একদিনে সীমাবদ্ধ নয় বরং সারা বছরের, গোটা জীবনের । আবেগের চেয়ে বিবেককে বেশি প্রধান্য দিতে শিখলেই আমাদের মঙ্গল হবে । পরবর্তী প্রজন্মকে সুস্থ-সংস্কৃতি চর্চার মানসিকতায় গড়ে তোলার জন্য ভালোবাসা দিবসের মত ক্ষতিকর উৎসব বর্জন করা আমাদের জন্য সময়ের দাবী । যতদ্রুত তা অনুধাবন করতে পারব, কল্যানও ঠিক ততোদ্রুত আমাদের দ্বারে এসে দাঁড়াবে ।
…….লেখক….রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

http://shamsfood.com/